শনিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৭, ৬ কার্তিক ১৪২৪, ৩০ মুহাররম, ১৪৩৯ | ০৯:১৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
  • শনিবার দৃশ্যমান হবে পদ্মা সেতু
  • বিশ্ব আইটি সম্মেলনে পুরস্কার পেল বিআইটিএম
  • নির্মাণের ২৯ বছর পর মুক্তি পাচ্ছে যে ছবি
  • খেলার খবর ফিরলেন নাসির-শফিউল, বাদ মাহমুদউল্লাহ-মুমিনুল
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ১২:৫৫:০৭ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

ভুলে যাওয়াও ভয়ংকর অসুখ

 চেনা পথও ভুল হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক কথাবার্তা ঘটনা মুছে গিয়েছে স্মৃতি থেকে। অতি পরিচিত লোকের নামও ভুলে যাচ্ছেন। নাম, তারিখের মতো প্রয়োজনীয় জিনিসও মন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। কথা বলার সময়ে ঠিক শব্দটা খুঁজে পাচ্ছেন না কিছুতেই। বাড়ির মধ্যেই কোথাও রেখেছেন ঘড়ি চাবি কি চশমা। কিন্তু মনে পড়ছে না। বয়সও ষাট ছাড়িয়ে। আর সমস্যা যদি ঘনঘন হয়, তা হলে বুঝতে হবে এটা ‘ডিমেনশিয়া’ বা স্মৃতিলোপেরই আলামত। স্মৃতিলোপের এই সব ঘটনা যদি নিয়মিত হতে থাকে তাকে বলে অ্যালজাইমার্স। 
বিশ্ব অ্যালজাইমার্স দিবস আজ। প্রতি বছর ২১ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালিত হয়। আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি চতুর্থবারের মতো পালন করা হচ্ছে। এ বছর পুরো সেপ্টেম্বরই বিশ্ব অ্যালজাইমার্সের মাস হিসাবে পালিত হবে। থিম হচ্ছে, ‘আমাকে স্মরণ কর।’ 
অ্যালজাইমার্স এর কারণ : মস্তিষ্কের মধ্যে প্রোটিন জমে এমন কিছু বাধা তৈরি হয়, যাতে স্নায়ুকোষগুলির মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ নষ্ট হয়ে যায়। কিছু রাসায়নিক যা স্নায়ুকোষের মধ্যে যোগাযোগ রাখতে সাহায্য করে তারও ঘাটতি দেখা যায়। ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিলোপ সাধারণত এর প্রথম লক্ষণ।  ক্রমশ সমস্যা বাড়তে থাকে। সারা বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে ৬৮ জন লোক আক্রান্ত হয় এই রোগে।এই রোগ সারানো যায় না শুধু চিকিৎসায় এর অগ্রগতি কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হয়। 
ভুলে যাওয়া কখনই ভাল নয়। ডিমেনশিয়া হতে পারে নানা কারণেই। কথাবার্তার খেই হারিয়ে ফেলা, বারবার এক কথা বলা, দূরত্ব বুঝতে অসুবিধে, সিঁড়ি ভাঙতে বা গাড়ি পার্ক করতে অসুবিধা, সিদ্ধান্ত নিতে না পারা, সমস্যার সমাধান করতে না পারা, পরপর কয়েক ধাপের কাজ (যেমন রান্না) করতে অসুবিধা এসবই কিন্তু ডিমেনশিয়ার লক্ষণ। এই লক্ষণগুলো অনেকে প্রথমটায় পাত্তা দেন না। বাড়ির লোকজনের কাছে পরিবর্তনগুলো বেশি ধরা পড়ে। তাই তারা এ বিষয়ে কিছু বললে উড়িয়ে না দিয়ে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিন। ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন। 
স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর ম্যাজিক : বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তির ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া স্বাভাবিক শারীরিক বৈশিষ্ট্য। সাধারণত ৪০ বছর বয়সের পর থেকে একজন মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। অনেকেই এটিকে রোগ ভেবে ভুল করেন। সবসময়ই এটি রোগ নয়। আবার বয়স ছাড়াও কখনও কখনও ভুলে যাওয়ার বাতিক লক্ষ্য করা যায়। মাঝে মধ্যে ভুলে যাওয়া মানেই স্মৃতিশক্তির কঠিন সমস্যা নয়। প্রিয় বন্ধুর সাথে দেখা হলো কিন্তু নাম মনে পড়ছেনা। আবার ড্রয়ারের চাবি কোথায় রেখেছেন তা ভুলে সারাবাড়ি মাথায় তোলা ইত্যাদি আমাদের জীবনে হরহামেশাই ঘটে। যখন তা বড়ো আকার ধারণ করে তখনই হয় বিপত্তি।
বয়স ছাড়াও নানা কারণে স্মৃতিভ্রংশ হতে পারে। যেমন- পারিবারিক ঝামেলার আধিক্য, মাথায় আঘাত, থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিকস, হাই কোলেস্টরল, ক্লান্তি, বিষন্নতা, নিঃসঙ্গতা ইত্যাদি। 
আবার নানাভাবে ভুলে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন-  সাম্প্রতিক ঘটনা ভুলে যাওয়া এবং চেষ্টা করেও মনে করতে না পারা, কথা বলার সময় বহুল ব্যবহৃত শব্দ মনে করতে না পারা, পরিচিত রাস্তা ভুলে যাওয়া, কোনও জিনিস যে জায়গায় রাখার কথা সেখানে না রেখে সম্পূর্ণ অন্য জায়গায় রাখা, কাজের প্ল্যান করতে না পারা অথবা প্ল্যান অনুযায়ী কাজ করতে না পারা, সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার অনিচ্ছা, অজানা জায়গা সম্পর্কে অহেতুক আশংকা, নিয়মিত অভ্যাসমূলক কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখার প্রবণতা, ব্যক্তিত্বের নেগেটিভ পরিবর্তন ইত্যাদি।
ভুলবশত ভুলে যাওয়া এক দুইবার হলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে বারবার হতে থাকলে অবশ্যই সেটা দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। যে কোন ধরনের ভুলে যাওয়ার মেডিকেল নাম অ্যামনেজিয়া। এর আবার নানা ভাগ আছে।
অ্যালজাইমার্স : এই রোগে সাধারণত মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ষাটোর্ধ ব্যক্তিদের এই রোগ হয়। তবে ৮০ বছরের উর্ধ্বে এই রোগের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। বংশগত কারণে ষাটের আগেও এই রোগ হতে পারে। থাইরয়েড নিঃসরণ হ্রাস পেলেও এই রোগ দেখা দিতে পারে। লক্ষণ হিসেবে দেখা যায় কথা বলতে সমস্যা হওয়া, হাত পায়ের দ্বারা সাধারণ কাজ করতে না পারা, এইমাত্র যা করলেন বা বললেন তা ভুলে যাওয়া, বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় যাবেন মনে করতে না পরা ইত্যাদি।
ডিমেনসিয়া : এই রোগ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের কোষ বা নিউরণগুলো শুকিয়ে যেতে থাকে। ফলে স্মৃতিভ্রংশ হয়। ডিমেনসিয়ার বিশেষত্ব হলো ভুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে  ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন ঘটে। কারণ মস্তিষ্কের সামনের অংশ ব্যক্তিত্ব গঠনে সাহায্য করে। ডিমেনসিয়া রোগে এই অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয় ফলে ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন হয়। সাধারণত ৮০ বছরের পর ডিমেনসিয়া হয়। তবে অনেক সময় নিজের অজান্তেই মস্তিস্কে ছোট ছোট স্ট্রোকের ফলে কোষ শুকিয়ে যেতে থাকে। সেক্ষেত্রে ৮০’র আগেও ডিমেনসিয়া হতে পারে।
প্রতিকার : মস্তিষ্কের নিউরোসেল সক্রিয় রাখার চেষ্টা করতে হবে, শরীর সচল রাখতে হবে ফলে তা মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন ঘটাবে, মাথায় বড় আঘাত থেকে সতর্ক থাকতে হবে, রক্তচাপ ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে, চর্বি কম খেতে হবে, ধূমপান সর্বাগ্রে বর্জনীয়। তবে বই পড়ার অভ্যাস ডিমেনসিয়া প্রতিরোধে দারুণ সাহায্য করে।
মনে রাখার কিছু কৌশল : বৈজ্ঞানিকভাবে মস্তিষ্কের গঠন বিশ্লেষণ করে একটি পন্থা আবিষ্কৃত হয়েছে। যার নাম নেমোনিক্স। নাম, তারিখ, তালিকা সবকিছু মনে রাখার এটি এক অনন্য পদ্ধতি। নেমোনিক্স বহুরকম হয় তবে তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পন্থা হচ্ছে কল্পনা এবং অনুষঙ্গ। এই পদ্ধতিতে আপনি যদি কারও নাম মনে রাখতে না পারেন তবে তার নামের সাথে মিল রেখে যেকোনো পরিচিত বস্তুর ছবি আঁকুন আপনার কল্পনায়। একবার যদি কল্পনার জাল বুনে ফেলতে পারেন তবে তার নাম ভোলার চান্স থাকবেনা বললেই চলে।
আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে রোমান রুম পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে আপনি যা মনে রাখতে চাচ্ছেন তার সঙ্গে পরিচিত একটি প্রেক্ষাপটে কল্পনা করুন। ধরা যাক আপনি বাজার করতে গিয়ে কাগজ আর পেন্সিল কিনবেন। চিন্তা করুন, একটি বাচ্চা কাগজ ছিড়ে কুটি কুটি করছে আর পেন্সিল দিয়ে এঁকে সারাবাড়ির দেয়াল নষ্ট করছে। দেখবেন সহজেই মনে রাখতে পারছেন।
আপনার নিজ থেকে আরও কিছু করণীয় আছে। যেমন- মস্তিষ্ক সজাগ রাখুন, খবরের কাগজ পড়ুন, সামাজিক অনুষ্ঠানে যান, সকলের সঙ্গে মিশুন, নিয়মিত অনুশীলন করুন, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন, রক্তচাপ ও কোলস্টেরল নিয়মিত পরীক্ষা করুন, কাঁচা লবন কম খান, রাতে সারাদিনের ঘটনা মনে করার চেষ্টা করুন, কবিতা পড়ুন, গান শুনুন, ছবি দেখুন, মন খুলে হাসুন ইত্যাদি। 
অ্যালজাইমার্স প্রতিরোধে মাছের তেলও বিশেষ উপাদেয়। কারণ- মাছের তেলে মানুষের স্মৃতিশক্তি বাড়ে এবং মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি করে। ২০১৪ সালে নারীদের স্বাস্থ্য ও স্মৃতি সংক্রান্ত একটি গবেষণা রিপোর্টে দাবি করা হয় মাছের তেল অ্যালজাইমার্সের মতো জটিল অসুখও প্রতিরোধ করে।
গবেষকরা জানান, মাছের তেলে রয়েছে উচ্চ মাত্রার ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড যা মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি করে। বয়স্কদের স্মৃতিধারণ ক্ষমতা বাড়াতেও এটি খুব কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। এই সমীক্ষার জন্য গড়ে ৭৮ বছর বয়সি ১১১১ জন নারীর লোহিত রক্তকণিকায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়েছিল। আট বছর পরে ওই নারীদের এমআরআই স্ক্যান করে দেখা গিয়েছে, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ যাদের বেশি রয়েছে, তাদের মস্তিষ্কের আকার ০.৭ শতাংশ বড়।
এই গবেষণা রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ নিউরোলজির একটি জার্নালে। তবে জার্নালটিতে পুরুষদের মস্তিষ্কে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের জন্য আকারে বৃদ্ধি পায় কি না তা এই রিপোর্টে স্পষ্ট করে বলা নেই।

 

আরো খবর